ভূ রাজনীতিতে বাংলাদেশ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ভূ রাজনীতিতে বাংলাদেশ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ফকর উদ্দিন মানিক: জন্মের সূচনালগ্ন থেকেই নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যা মোকাবিলা করেই দৃপ্তপথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রাচীনকাল থেকেই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত জাতি রক্ত দিয়ে রাজনৈতিক মুক্তি পেলেও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময়ে দেশটির বিরুদ্ধে চলছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। তারা বিভিন্নভাবে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে আঘাত করছে। তাই এখন সবার একটাই প্রশ্ন-পরাশক্তিগুলো কি পারবে বাংলাদেশকে তাদের ভ‚রাজনীতির দাবার ঘুঁটি বানাতে, নাকি বাংলাদেশই হবে আঞ্চলিক ভ‚রাজনীতির কেন্দ্র?
টানা চতুর্থবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে অভ‚তপূর্ব উন্নতি সাধনের মাধ্যমে বিশ্বরাজনীতির অংশ হিসাবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার জটিল সমীকরণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভ‚রাজনীতির ট্রাম্প কার্ড এখন বাংলাদেশ। কারণ, বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারত, উন্নয়ন অংশীদার চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। সম্পর্কের এ দৃঢ়তা ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অসাধারণ প্রয়োজনীয়তা এদেশকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশের সঙ্গেও দরকষাকষির সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
ভৌগোলিক গুরুত্ব, অবারিত প্রাকৃতিক সম্পদের আধার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামগ্রিক উন্নয়ন, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র অর্থনীতি ও ভ‚রাজনৈতিক গুরুত্বের জন্যই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগে বঙ্গোপসাগরের ভ‚মিকা, ভ‚রাজনৈতিকভাবে বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা, চীনের অন্যতম বাণিজ্যিক পথ মালাক্কা প্রণালি, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সংযোগ, ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যের স্থিতিশীলতা, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং সর্বোপরি দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী দেশ হিসাবে এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ রয়েছে বলেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি উদীয়মান শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ। ফলে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর চোখ এখন বাংলাদেশের দিকে। তাই একসময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে আখ্যায়িত করা দেশও এখন উন্নয়নের রোল মডেল।
সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়-পররাষ্ট্রনীতির এ মূলমন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইদানীংকালে বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ বিষয়ে হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে মন্তব্য করেছে চীন ও রাশিয়া। এমনকি ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের স্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনকে অনুরোধ জানিয়েছে। এর ফলে ক‚টনৈতিক দক্ষতায় একটি সুনির্দিষ্ট ইতিবাচক অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। তবে অনেকের প্রশ্ন, পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোই কি মানবাধিকারের নামে মার্কিন ভিসানীতির মূল কারণ?
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে ২ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে। কয়েক মাস পরেই চীন বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়; যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঋণ প্রতিশ্রæতি। চীন ও ভারতের মধ্যে ভ‚রাজনৈতিক দ্বৈরথ থাকলেও বাংলাদেশ দুই দেশের সঙ্গেই সৌহার্দপূর্ণ ক‚টনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করে যাচ্ছে; যা এককথায় চমৎকার পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টান্ত। আর এ স্বাধীন ও যুগোপযোগী পররাষ্ট্রনীতির কল্যাণে ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক করিডরের একটি হাবে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ।
একদিকে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান; অন্যদিকে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, মাঝে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর যুক্তরাজ্য-ভ‚রাজনীতিতে বিশ্বের সব বলয়ের সঙ্গে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে বাংলাদেশ। ভ‚রাজনীতিতে বিভিন্ন দিক থেকে বাংলাদেশ নিজেদের সক্ষমতা সৃষ্টি করতে পেরেছে। বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে বিশ্বের পশ্চিম প্রান্তের সংযোগ ঘটানো, ল্যান্ডলক দেশ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, ১৬ কোটি মানুষের বাজার, অদম্য অর্থনৈতিক উত্থান, তৈরি পোশাক খাতের বহুমুখী উৎপাদন ও অগ্রগতি, জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে নেতৃত্ব দেওয়া, টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা বাংলাদেশকে ভ‚রাজনীতিতে বিশ্বের পাওয়ার প্লেয়ারদের সঙ্গে এক কাতারে নিয়ে আসছে। সমুদ্র যাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বিশ্বও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলেই কি বঙ্গোপসাগর-তীরবর্তী বাংলাদেশকে কাছে টানতে এতটাই মরিয়া বিশ্বরাজনীতির মোড়লরা?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি ছিল ইতিবাচক নিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জোট নিরপেক্ষতা এবং সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক; যা ভ‚রাজনৈতিক ন্যায়সংগত স্বার্থ আদায়ে অত্যন্ত কার্যকর হবে। পরিবর্তনশীল ভ‚রাজনীতির সঙ্গে বিশ্বব্যাপী আন্তর্দেশীয় সম্পর্কের হিসাবনিকাশের সমীকরণ ক্রমেই জটিল হচ্ছে। এ কারণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকেও বিদেশি শক্তি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অন্যায় ও অন্যায্য চাপ সামাল দিতে টানাপোড়েনের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এর মধ্যে যেমন ঝুঁকি আছে, তেমনই লাভবান হওয়ার সুযোগও আছে। গত পাঁচ দশকের পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ ভ‚রাজনীতিতে নিরপেক্ষ ভ‚মিকা পালন করলেও সা¤প্রতিক সময়ে পরাশক্তিগুলো নিজেদের বলয়ে নেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ দিলেও তারা ভুলে গেছে বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারে না। এমনকি জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার হলেও মাথা নোয়ায় না।
স্বাধীনতার ৫২ বছর পেরিয়ে উন্নয়ন সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও ভ‚রাজনৈতিক নানা কারণে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে এখন ঢাকা। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক, অসা¤প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্ভাসিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়ে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে সম্মুখপানে অগ্রসর হয়ে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্কের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনে নবতর অধ্যায় বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে দাবার ঘুঁটি নয়, বরং আঞ্চলিক ভ‚রাজনীতির ট্রাম্প কার্ড হবে-এটাই চাই আমরা।

editor

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *