আলোকিত মানুষ চাই

আলোকিত মানুষ চাই

হারুন-অর-রশিদ: আজকের এই ঘুণেধরা, ক্ষয়ে যাওয়া সমাজটাকে পরিবর্তন করে মানুষের জন্য বসবাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন আলোকিত মানুষ। এখন প্রশ্ন হলো এই আলোকিত মানুষ কারা? তাদের বৈশিষ্ট্যই বা কি? আমার মনে হয় আলোকিত মানুষ তারাই যারা জাতীয় জীবনের বিভিন্ন অঙ্গনে শক্তিমান নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যাদের নিরঅহংকার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সততা এবং কর্ম মানুষকে সত্যিকারের মানুষ হতে অনুপ্রাণিত করে তারাই আলোকিত মানুষ। আলোকিত মানুষ হতে হলে অবশ্যই ভালো মানুষ হতে হবে। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ‘দ্য মোরাল বাকেট লিস্ট’-এ ডেভিট ব্রæকস লিখেছেন, ‘ভালো মানুষ অন্তর থেকেই ভালো, তারা ভালো শুনে, তারা আপনাকে আনন্দ দেয়। আমরা ঠিক এমনই মানুষ হতে চাই।’ ডেভিড ব্রুক্স এর সংজ্ঞার সাথে অনেকের দ্বিমত থাকলেও এটা সত্য যে, অন্তর থেকে কেউ ভালো মানুষ না হলে তার পক্ষে আলোকিত মানুষ হওয়া সম্ভব নয়। দার্শনিক সক্রেটিস আবার যেমন বলেছেন, ‘সদ্ব গুণই জ্ঞান’। অর্থাৎ অসৎ ব্যক্তি জ্ঞানী হতে পারে না। তাই সহজবোধ্যভাবে বলা যায়, আলোকিত মানুষের মধ্যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সততা, পরোপকারীতা, বিনয়ী এবং সত্য সন্ধানের ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে।


আলোকিত মানুষের গুণাবলি অর্জনের জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই। বই মানুষের মনের কালিমা দূর করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে। আলোকিত মানুষ গড়তে এবং সমাজ থেকে কুসংস্কার ও অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করতে বইয়ের বিকল্প নেই। চেতনার বিপ্লব ঘটাতে, নৈতিক ও মানসিক বোধ জাগ্রত করতে বইয়ের চাইতে সহায়ক আর দ্বিতীয়টি নেই। আমাদের প্রিয় নবি হযরত মোহাম্মদ (সা.) সর্বপ্রথম পবিত্র কোরআনের যে বাণী শুনতে পেয়েছিলেন তাহলো, ‘আল্লামা বিল কলাম’ অর্থাৎ আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন, কলমের মাধ্যমে। আর কলমের আশ্রয়তো পুস্তকে। পবিত্র কোরআন মজিদে আরও বলা হয়েছে, ‘পড় তোমার রবের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। পড়, আর তোমার রব মহামহিম।’ (সূরা আলাক ১-৩)। নবি করিম (সা.) হাদিসে উল্লেখ করেছেন, ‘ঘন্টা খানেকের জ্ঞান সাধনা সমগ্র রজনির ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’। যে জ্ঞান মানুষের চরম লক্ষ্য। আর এই চরম লক্ষ্যে পৌঁছাতে গেলে বিদ্যা শিক্ষা বা বইয়ের বিকল্প নেই। বই আত্মাকে পরিপুষ্ট করে, জ্ঞানকে করে সমৃদ্ধ। আলোকিত মানুষ গড়তে বই মানুষের বুকের ভেতর সযতেœ লালন করা স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে পারে। মানুষের স্বপ্ন যদি সুন্দর না হয়, তার ধ্যানধারণা, চিন্তাচেতনা, চলন-বলন, মনমনন যদি অন্যের থেকে সত্য ও বাস্তবময় না হয় তাহলে তিনি আলোকিত মানুষ হতে পারবেন না।


আমাদের বর্তমান সমাজ যে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে তার থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সমাজের আলোকিত মানুষগুলিকে সামনে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক সভ্য সংস্কৃতি আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম অস্থির সময় পার করছে। ভিন্ন সংস্কৃতির আগ্রাসনে দোলাচলে ভাসছে, বিভ্রান্ত হচ্ছে। ভালো-মন্দ বিচার করতে গিয়ে সংকটে পড়ছে। সঠিক পথ বেছে নিতে গিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের দিক নির্দেশক হতে পারেন আলোকিত মানুষগণ।
আলেকজান্ডার দি গ্রেট উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন যে, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে সময় এবং জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে-মানুষের জন্য কিছু করা।’ বর্তমান এই অস্থির বকে যাওয়া সময়টাকে যদি সুস্থতার দিকে ফিরিয়ে আনা না যায় তাহলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম যে অমানিশার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের প্রিয় নবি হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম লগ্নে আরবের অবস্থা কতটা খারাপ ছিল তা আমাদের সকলেরই জানা। সেই সময় সেখানে সভ্যতা বলতে কোনো কিছু ছিল না; মানুষের মুল্যবোধ বলতে কোনো শব্দ ছিল না; নারীর মর্যাদা বলতে কিছু ছিল না। এমন এক ভয়ঙ্কর অন্ধকারে নিমজ্জিত সমাজকে হযরত রাসুল (সা.) তার নীতি আদর্শ এবং কোরআনের আলো দ্বারা সবচেয়ে বেশি আলোকিত করেছিলেন। তিনি যে আদর্শ রেখে গেছেন আমরা যদি তা ধারণ করে চলতাম তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত এই সমাজে কোনো অন্যায়, অবিচার, জুলুম-নির্যাতন হতো না। কালের পরিক্রমায় কত মানুষ যে এই পৃথিবীতে জ্ঞানের আলো নিয়ে এসেছেন তার হিসেব নেই। তারা আলো ছড়িয়ে গেছেন বলেই সমাজে এখনো কিছুটা সভ্যতার আলো দেখতে পাই।


আমরা এ পৃথিবীতে সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে জন্মেছি। ভুল-ত্রæটি নিয়েই আমাদের জীবন চলা। ভালো-মন্দ মিলিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা। পৃথিবীর বিরাট জনসংখ্যার সব মানুষই আলোর সন্ধান পায় না। যারা পান তারা হয়ে ওঠেন সচেতন, বিবেকবান, নৈতিকতাসম্পন্ন, চারিত্রিক সৌন্দের্যে বলীয়ান। যারা ভালো, আদর্শবান, শ্রেষ্ঠ মানুষ তাদের জীবনের সৌন্দর্যের আলোতেই আলোকিত হয় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্ব।


বর্তমানে গোটা পৃথিবী জুড়েই চলছে আধিপাত্যের যুদ্ধ, ধর্মে ধর্মে যুদ্ধ, দখল দারিত্বের যুদ্ধ, সম্পদ লুণ্ঠনের যুদ্ধ, বর্ণবৈষম্য, ভৌগোলিক আধিপত্য প্রদর্শনমূলক শক্তি প্রদর্শন, হত্যা নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি। মুক্তির পথ দিনে দিনে রুদ্ধ হয়ে আসছে। অপরাজনীতি, অপ-সংস্কৃতির চরম দৌরাত্মে সমাজের বন্ধন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। রক্তের বন্ধন দিনে দিনে শীতলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিবেকবান মানুষের পরিবর্তে রক্তচোষা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধনী-দরিদ্র্যের মধ্যে বৈষম্যের মাত্রা সীমানা অতিক্রম করে ফেলেছে। রাষ্ট্র সমাজের এই চিত্র দেখে মনে হয়, মানুষের কাছে মানুষের মূল্যই মনে হয় সবচেয়ে কম। আজকে সিরিয়া, সুদান, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, সোমালিয়াসহ এমন অনেক রাষ্ট্র আছে যেখানে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, খাদ্যের অভাবে কোটি কোটি মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, যুদ্ধ বিগ্রহই যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। মানবিক ন্যূনতম মর্যাদা তাদের নেই। অথচ বিবেকহীন বিশ্বের আধিপত্যে বিশ্বাসী রক্তপিপাসু রাষ্ট্রগুলোর নেতারা মানবতার দোহাই দিয়ে তারাই এমন কর্ম করে চলেছে।


আমরা যদি আমাদের (বাংলাদেশের) বর্তমান সমাজের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব আমাদারে সমাজে নৈতিকতা হারিয়ে সমাজে এক বিরাট অস্থিরতা বিরাজ করছে। দেশে নব্য ধনীদের উত্থান, ধনী দরিদ্রের ব্যবধান ও আয় বৈষম্যের কারণে প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমান আজ প্রায় বিধ্বস্ত। বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে আজ আর শান্তির সুবাতাস বয় না। মধ্যবিত্ত ও অল্প আয়ের মানুষের পক্ষে পরিবার পরিজনকে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকাই একরকম অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে যেখানে কিছু মানুষের ধনসম্পত্তি হুহু করে বাড়ছে, সেখানে বেশিরভাগ মানুষই অতি কষ্টে জীবন চালনা করছে। জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে পড়া এসব মানুষ চারপাশের জৌলসময় জীবনধারার সঙ্গে ঠিক তাল মেলাতে পারছে না। অপমান, ব্যর্থতা ও লজ্জায় কেউ কেউ মাথা করে মেনে নিলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেকের পক্ষেই সমাজের এই অপ্রত্যাশিত বৈষম্যের ভয়াবহতা মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলশ্রæতিতে সৃষ্টি হচ্ছে অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক অস্থিরতা যা আমাদের গোটা সমাজের স¤প্রীতিকে বিনষ্ট করছে। যার কারণেই আমরা দেখতে পাচ্ছি একের পর এক ভয়ঙ্কর ইস্যু তৈরী করে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরী করে শত শত মানুষের সামনে মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করছে অথচ কেউ রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসছে না। মানবতা আজ বিপন্ন।

মানুষে মানুষে বিশ্বাসের জায়গাটা আজ এতটা সংকীর্ণ হয়ে গেছে যে, কেউ কারো কাছে নিরাপদ না। সন্তানও আজ তার পিতার কাছে নিরাপদ না, একজন ছাত্রীও তার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছে নিরাপদ না। প্রতিনিয়তই আমাদের সামনে বকে যাওয়া সমাজের খন্ড চিত্র নগ্নভাবে ধরা দিচ্ছে। শিক্ষা, সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তনের কারণে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার জায়গাটা আগের মত আদর্শবাদী জায়গায় নেই।


কোনটি আদর্শ আর কোনটি অনাদর্শ তা নির্ণয় করার মত যোগ্যতা বোধ হয় আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। কারণ যারা আদর্শ চর্চা করার জন্য জনগণকে অনুপ্রাণিত করত তেমন আলোকিত ব্যক্তিত্ব আর আমাদের সমাজে নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো জ্ঞানী ও গুণী মানুষের কদর কমে যাওয়ায় যারা জ্ঞান চর্চা করেন তারা আর সমাজে উম্মোচিত হতে চান না। এটা একটি সুষ্ঠু সমাজ গঠনে বিরাট প্রতিবন্ধকতা।


কিন্তু এটাতো বাস্তব, একটি দেশ একটি সমাজ এভাবে বেশি দূর এগোতে পারে না। এখানে অবশ্যই পরিবর্তন প্রয়োজন। সমাজকে এই অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন আলোকিত মানুষের সংস্পর্শ। এই ক্ষয়ে যাওয়া, অস্থির সমাজটাকে ঠিক করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, মাহাথির মোহাম্মদ, এরদোগানের মতো আলোকিত রাষ্ট্রনায়কদের যারা সামাজিক বৈষম্যকে নিরসন করে একটি ভারসম্যমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠন করতে পারেন।

editor

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *