ইউরোপ হবে শক্তিশালী বৈশ্বিক অংশীদার

ইউরোপ হবে শক্তিশালী বৈশ্বিক অংশীদার

অনলাইন ডেস্ক: ৯ই মে, দিনটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই দিনে সারা বিশ্বে ইউরোপ দিবস পালিত হয়। ২৭টি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে এবং ৪৫০ মিলিয়ন ইইউ নাগরিক নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এগিয়ে যাচ্ছে একতা ও সম্মিলিত সম্পৃক্ততার ধারা বজায় রেখে।


যদি গোঁড়ার দিকে যাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে ইইউ-এর যাত্রা শুরু। বলা বাহুল্য, এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বিপর্যয় যেন পুনরাবৃত্তি না হয়।


ইইউ-এর প্রথম ধারণা আসে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট শুম্যানের কাছ থেকে ১৯৫০ সালের ৯ মে। যেহেতু কয়লা ও ইস্পাত যুদ্ধের মূল উপাদান হিসাবে স্বীকৃত, তাই এর লক্ষ্য ছিল একটি ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত জোট গঠন করা; যা কয়লা ও ইস্পাত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করবে। পরবর্তী দশকগুলোয় এই জোট থেকে ১৯৯৩ সালে আজকের ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাস্তব রূপ পায়। পর্যায়ক্রমে গঠনমূলক ও উন্নয়নশীল প্রকল্পগুলোই ইইউ-এর সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।


যে কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্রই ইইউতে যোগদান করতে পারে, শুধু সদস্য হওয়ার জন্য কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্তাবলি পালন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ৪টি ‘প্রার্থী’ দেশ যোগদান প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। আমরা সবাই জানি, ২০২২ সালের জুনে ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।


ইইউ-এর সমন্বিত উন্নয়নের রয়েছে বেশকিছু মাত্রা। এর আলোকেই ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে পণ্য, পরিষেবা এবং মানুষের অবাধ চলাচলের মাধমেই ইইউ-এর একক বাজারের সূচনা হয়। এর ছয় বছর পর ১৯৯৯ সালে বাজারে আসে ইউরো।


উল্লেখ্য, ইইউ-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক পরিষেবা। আমরা যেন ভুলে না যাই-বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদ ইইউ-এর আদর্শের পরিপন্থি। বৃহত্তর বিশ্বের কাছে একটি দায়িত্ববোধ থেকে মানবিক এবং উন্নয়ন সহায়তায় ইইউ রয়েছে অটল-অবিচল।


গত ২০ বছরে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের উদ্ধার, ফিলিস্তিনি পুলিশবাহিনীকে সহায়তাসহ ৩৭টি বেসামরিক-সামরিক মিশনে ইইউ যুক্ত রয়েছে। ইউরোপের বাইরে ১৪০টিরও বেশি ইইউ প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে (বাংলাদেশে ইইউ প্রতিনিধিদলসহ), যারা ইইউ-এর বাণিজ্য, রাজনৈতিক, উন্নয়ন এবং মানবিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।


এবার আসি ইইউ-এর বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততায়। ৭০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি, স্বল্পোন্নত দেশের জন্য ইইউ বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত ব্যবসার সুযোগ দিয়ে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। এই মূল্যবোধ থেকেই ইইউ বাংলাদেশের উন্নয়নের পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশি পণ্য যেন ইইউ বাজারে সর্বোত্তম প্রবেশাধিকার পায় এবং জিএসপি প্লাসে (জিএসপি+) রূপান্তরের পথ যেন মসৃণ হয়, এই লক্ষ্যে ইইউ বাংলাদেশের সঙ্গে ৩২টি পরিবেশ ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।


উল্লেখ্য, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইইউ তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা ব্যবহার করছে।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সব সমস্যা মোকাবিলায় ইইউ আরও শক্তিশালীভাবে তার কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালনা করছে। ইউরোপীয় জলবায়ু আইন ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপের অর্থনীতি এবং জলবায়ুনিরপেক্ষ সমাজ হওয়ার জন্য ইউরোপীয় গ্রিন ডিলে নির্ধারিত লক্ষ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে। আইনটি ২০৩০ সালের মধ্যে নিট গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনকে ১৯৯০ সালের তুলনায় কমপক্ষে ৫৫ শতাংশ হ্রাস করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রয়োজন-এমন দেশগুলোর প্রতি তার দায়িত্ব স্বীকার করে জলবায়ু অর্থায়নের বৃহত্তম দাতা হিসাবে ২০২১ সালে ২৩ বিলিয়ন ইউরো দেয়।


ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েনের ভাষায় ‘বিনিয়োগের জন্য একটি নতুন কৌশলগত পদ্ধতি’ প্রদানের জন্য বিশ্বব্যাপী একটি নতুন উদ্যোগ ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ চালু করা হয়েছে। গ্লোবাল গেটওয়ের আওতায় বিশ্বজুড়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ইইউ প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করেছে। যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই, নবায়নযোগ্য শক্তির উন্নয়নে সহায়তার জন্য ইইউ-এর রয়েছে অর্থায়নের পরিকল্পনা।


ইইউ-এর অন্যতম নীতি হচ্ছে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র। ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস ও ইইউ ফান্ডামেন্টাল রাইটস এজেন্সি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের অধিকার এবং তাদের জাতীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে ইইউ-এর সব দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে এই মূল্যবোধগুলোর জন্য একটি যৌথ চুক্তি রয়েছে। এছাড়াও ইইউ সুশীল সমাজসহ বিশ্বের মানবাধিকারকর্মীদের সমর্থন করে।


দুঃখজনক হলেও সত্য-ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, লাখ লাখ মানুষ হয়েছেন গৃহহারা এবং ইউরোপ পতিত হয়েছে আরেক ধ্বংসযজ্ঞে। শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের সব শান্তি ও সমৃদ্ধিই আজ হুমকির মুখে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থি এবং ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে লঙ্ঘন করে। এই অন্ধকার সময়ে প্রতিবেশী হিসাবে ইইউ এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো ইউক্রেনের পাশে আছে।


এ বছর আমরা ইউরোপ দিবস উদযাপন করছি, যার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি মাইলফলক-বাংলাদেশে ইইউ অর্ধশতবর্ষ পূর্তি। এই ক্ষণে আমরা মনে করতে চাই ৭৩ বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অগ্রগতি। আমাদের সাফল্য মনে রাখার পাশাপাশি বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতাগুলোকে ভুলে গেলে চলবে না।

editor

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *