(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
তানভীর আহমেদ: পৃথিবীতে বদলে দেওয়া আবিষ্কারের আরও কিছু আবিষ্কার নিম্নে দেওয়া হলো-
ছাপাখানা
মানব সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছিল ছাপাখানা। পঞ্চদশ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার প্রিন্টিং প্রেস। এটি এমন এক যান্ত্রিক পদ্ধতি, যা কোনো কাগজ বা কাপড়ের পৃষ্ঠে চাপ প্রয়োগ করে কালি বা রঙের একটি আস্তরণ তৈরি করে। এই আস্তরণ হতে পারে কোনো লেখা বা কোনো নকশা বা চিত্র। জোহানেস গুটেনবার্গকে মূলত প্রিন্টিং প্রেসের আবিষ্কারক হিসেবে মানা হয়। ১৪৪০ সালের দিকে তিনি এটি আবিষ্কার করেন। তিনি ছিলেন জার্মানির অধিবাসী এবং পেশায় একজন স্বর্ণকার। অবশ্য প্রিন্টিংয়ের ইতিহাস শুরু হয় আরও অনেক আগে থেকেই। গুটেনবার্গের এই আবিষ্কারের প্রায় ৬০০ বছর পূর্বে চীনা সাধকরা ব্লক প্রিন্টিং নামের একটি পদ্ধতির আবিষ্কার করেন। এতে কাঠের তৈরি কোনো ব্লকে কালি লাগিয়ে কোনো কাগজের পৃষ্ঠে নকশা বা লেখা প্রিন্ট করা হতো। যা ৮ম শতকে কোরিয়া এবং জাপানেও প্রচলিত ছিল। এরপর ধীরে ধীরে বিকাশ ঘটতে থাকে প্রিন্টিং পদ্ধতির। এছাড়া ইউরোপে সেসময় জাইলোগ্রাফি নামক আরেকটি প্রিন্টিং পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। তবে সবকিছুর অবসান ঘটে গুটেনবার্গের আবিষ্কারের মাধ্যমে। তিনি এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন, যা দিয়ে হাতে হাতে প্রেসিং করে মুদ্রণ করার বদলে মেকানিক প্রেসিং করা যেত।
স্টিম ইঞ্জিন
স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারের আগে কলকারখানার বেশিরভাগ পণ্যই হাতে তৈরি হতো। এছাড়া পানিচালিত কিংবা পশুটানা যন্ত্রগুলোই ছিল শক্তির প্রধান উৎস। ১৭১২ সালে থমাস নিউকোমেন সর্বপ্রথম বাষ্পকে কাজে লাগিয়ে পানির পাম্পের ইঞ্জিন তৈরি করেন। এরপর ১৭৬৯ সালে জেমস ওয়াট নিউকোমেনের এই ইঞ্জিনের কিছু পরিবর্তন আনেন। তিনি ইঞ্জিনে পানি থেকে বাষ্প প্রস্তুতকারী যন্ত্র সংযুক্ত করেন। ফলে ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা আরও বেড়ে যায় আর ইঞ্জিনটি হয় আরও ব্যবহারযোগ্য। তার তৈরি এই ইঞ্জিন ঘূর্ণন শক্তি উৎপন্ন করতে পারত। জেমস ওয়াটের এই ইঞ্জিন আবিষ্কারের ফলে মানুষ ইঞ্জিনচালিত গাড়ি তৈরি করতে সক্ষম হলো। সেই সঙ্গে তৈরি হলো ইঞ্জিনচালিত রেলগাড়ি। ফলে দ্রæতগতিতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে সক্ষম হলো মানুষ। স্টিম ইঞ্জিন তৈরির প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে ডার্টমাউথ নিবাসী নিউকোমেন একটি স্টিম ইঞ্জিন নির্মাণ করেন। যা ব্যবহৃত হতো কয়লা উত্তোলনে। তবুও বিংশ শতকের প্রথম দিকেই বাষ্পচালিত এরূপ টারবাইন নির্মাণ করা হয়েছিল, যার একেকটির সাহায্যে ৪৩ হাজার ৭০০টি অশ্বের শক্তির সমান কাজ করা সম্ভব ছিল। এখনো বিশ্বের বিভিন্ন পাওয়ার প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য স্টিমচালিত টার্বাইন ব্যবহার করা হয়।
টেলিফোন
টেলিফোন আবিষ্কার ছিল বিজ্ঞানের একটি কল্পনাতীত অধ্যায়। একবার ভাবুন তো, পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, দূর থেকে দূরান্তে কারও সঙ্গে কথা বলি, একটু হলেও কি অবাক হই না! তাহলে বুঝুন এই যন্ত্র আবিষ্কারের পর মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল। আলেক্সান্ডার গ্রাহামবেলকে টেলিফোনের আবিষ্কারক হিসেবে ধরা হয়। তবে এ নিয়ে কিছুটা দ্ব›দ্ব আছে। আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল এবং ইলিশা গ্রে উভয়েই ওয়াশিংটনের পেটেন্ট অফিসে ১৮৭৬ সালে টেলিফোন আবিষ্কারের পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশন জমা দেন। আর সেসময় গ্রাহামবেলের আবেদনটি আগে নিবন্ধিত হয়। একই জুনে ফিলাডেলফিয়ার প্রদর্শনীতে বেল প্রথমবারের মতো তার আবিষ্কৃত টেলিফোন উপস্থাপন করেছিলেন। যন্ত্রটি সফলতার সঙ্গে একপ্রান্তে উচ্চারিত শব্দ অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারত। অবশ্য তার টেলিফোনটির ব্যবহার ছিল খানিকটা কষ্টসাধ্য। তবে ১৮৭৭ সালে তিনি টেলিফোনকে সহজে ব্যবহারযোগ্য করে উৎপাদন শুরু করেন এবং ক্রমান্বয়ে ইউরোপের বাজারে ছড়িয়ে দিতে থাকেন।
খাদ্যমজুদ কিংবা শীতলকরণের মেশিন
খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দের দিকে প্রাচীন পারস্যে হিমায়ক কক্ষ তৈরি করা হতো। যাকে ‘ইয়াখছাল’ বলা হতো। একে বর্তমানের বরফঘরের সঙ্গে তুলনা দেওয়া যেতে পারে। মূলত বরফঘরের প্রয়োজন মেটানোর জন্যই তৈরি করা হতো। এর উপরিভাগ ছিল গম্বুজাকৃতির এবং ভেতরের দিকে ছিল কতক ফাঁপা জায়গা। নিরেট, তাপরোধী কিছু গাঠনিক উপাদান দিয়ে ভেতরে ফাঁপা জায়গা মুড়িয়ে দেওয়া হতো। অন্তভৌমের ফাঁপা জায়গার আয়তন হতো ৫ হাজার ঘন মিটারের মতো। কাঠামোটিতে শীতল বাতাস প্রবেশ করত এর ভিত্তি এবং অন্তভৌমের ফাঁপা অংশ দিয়ে। এর মোচাকৃতির গঠন দিয়ে গরম তাপ বেরিয়ে যেত। ফলে ভেতরের অংশের তাপমাত্রা হতো বাইরের অংশ থেকে কম। এগুলো তৈরি করা হতো সারোজ নামে পানিরোধী হামানদিস্তা দিয়ে। বালি, কাদা, ডিম, ছাগলের পশম এবং ছাই সঠিক অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি করা হতো সেই বিশেষ হামানদিস্তা। এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো- এটি তাপ ও পানিরোধের উপযোগী। এর আসল কাজ ছিল বরফ সংরক্ষণ করে রাখা। বরফের পাশাপাশি এতে খাবারও সংরক্ষণ করা হতো।
ইন্টারনেট
পৃথিবীতে যে আবিষ্কারটি গোটা বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি বদলে দিয়েছে সেটি হলো ইন্টারনেট। আমরা এমন এক সময়ে এসে পৌঁছেছি যে, ইন্টারনেট ছাড়া আমরা একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না। ইন্টারনেট বিশ্বব্যাপী তথ্য আদানপ্রদান ও প্রচারের জন্য একটি অভূতপূর্ব মাধ্যম। ১৯৬০-এর গোড়ার দিকে ইন্টারনেটের আগমন ঘটে। এম-আইটির জে.সি.আর. লিক্লাইডার ‘ইন্টারগ্যাল্যাক্টিক নেটওয়ার্ক’ নামক একটি ধারণার জন্ম দেন। এই পদ্ধতিতে কম্পিউটারকে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়। এরপর ১৯৬০-এর শেষের দিকে অজচঅঘঊঞ বা অফাধহপবফ জবংবধৎপয চৎড়লবপঃং অমবহপু ঘবঃড়িৎশ-এর আগমন ঘটে। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অর্থায়নে তৈরি একটি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা যা কয়েকটি কম্পিউটারকে একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসত। ১৯৮৩ সালের পর থেকে বিজ্ঞানীরা আধুনিক ইন্টারনেট আবিষ্কারের দিকে এগোতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি আসে বিজ্ঞানী টিম বার্নাস লির ডড়ৎষফ ডরফব ডবন বা ডডড আবিষ্কার। তার এই আবিষ্কার হাইপার-লিংক বা ওয়েবসাইটভিত্তিক ইন্টারনেটের সূত্রপাত ঘটায়।
কম্পিউটার
বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার কম্পিউটার। এটি এমন এক যন্ত্র যাতে কোনো তথ্য বা উপাত্ত প্রবেশ করালে সেই তথ্যকে নিপুণভাবে ব্যবহার নতুন তথ্য বা ফলাফল পাওয়া যায়। চার্লস ব্যাবেজকে কম্পিউটারের জনক বলা হয়। তবে এই আবিষ্কারের সূত্রপাত হয় অ্যাবাকাস আবিষ্কারের মাধ্যমে। এরপর ব্রেইজ প্যাসকেল সর্বপ্রথম ক্যালকুলেটিং মেশিন আবিষ্কার করেন। পরে গণকযন্ত্রের ইতিহাসে যোগ হয় বিখ্যাত জার্মান ভিলহেলম লিবনিজের নাম। তার গণক যন্ত্র যোগ-বিয়োগের সঙ্গে গুণ ভাগও বের করতে পারত। ১৯৪০ সালে ক্লড শ্যানন প্রথম ডিজিটাল ইলেকট্রনিক কম্পিউটার আবিষ্কার করেন। প্রোগ্রামেবল ডিভাইসের জন্য এটি সম্ভাবনার দুয়ার খোলে। ১৯৪১ সালে করনার্ড জিউস আবিষ্কার করেন পৃথিবীর প্রথম অপারেশনাল কম্পিউটার। যা মার্কেটে আসতে থাকে ১৯৭৭ সালের দিকে। তবে বর্তমান কম্পিউটারের রূপরেখা তৈরি করেন ব্রিটিশ গণিতবিদ ‘চার্লস ব্যাবেজ’। ১৮২২ সালে তিনি লগারিদমসহ গাণিতিক হিসাবনিকাশ সহজ করার লক্ষ্যে একটি যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করেন। এরও পরে ১৮৩৩ সালে তিনি আগের সব গণনাকারী যন্ত্রের স্মৃতিভাণ্ডারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এজন্য তিনি একটি যন্ত্র তৈরি করেন, যার নাম দেন অ্যানালটিক্যাল মেশিন। এর কাজ অবশ্য তিনি শেষ করতে পারেননি। তার এ মেশিনের ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করেই আজকের এ কম্পিউটার তৈরি করা হয়েছে। এজন্যই তাকে কম্পিউটারের জনক বলা হয়। কম্পিউটারের বড় সাফল্য আসে মাইক্রোপ্রসেসর আবিষ্কারের ফলে। ব্যবহারের সুবিধা এবং কাজের ক্ষমতা বেড়ে যায়।